শ্রীপুরে বিলুপ্তপ্রায় খেজুর রসের ঐতিহ্য
গাজীপুরের শ্রীপুরে শীত মানেই খেজুর রসের যে পরিচিত দৃশ্য ছিল, তা এখন আর আগের মতো দেখা যায় না। এক যুগ আগেও ভোর হলেই বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে গাছিদের ব্যস্ততা চোখে পড়ত। কাঁধে হাঁড়ি নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রস বিক্রি করতেন তারা। কিন্তু শিল্পায়ন, বনভূমি উজাড় ও কৃষিজমি সংকোচনের কারণে কমে গেছে খেজুর গাছ, ফলে হারিয়ে যাচ্ছে গাছি ও রস সংগ্রহের ঐতিহ্য।
হেরা পটকা গ্রামের হাবিবুল্লাহ জানান, আগে শত শত গাছ থেকে রস আসত, গুড় বানানোর সুবাসে বাড়ি মুখর থাকত। এখন সেই স্মৃতি শুধু গল্পেই বেঁচে আছে। একই গ্রামের জাকির হোসেন বলেন, একসময় মা–দাদিদের হাতের রসের পিঠা–পায়েস শীতের আনন্দ বাড়িয়ে দিত; এখন কাঁচা রস বা গুঁড় চোখেই পড়ে না।
গাড়ারন গ্রামের অভিজ্ঞ গাছি আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, “আগে প্রচুর গাছ ছিল, রসও পেতাম। অনেক গাছ কেটে ফেলতে হয়েছে, আর গাছ নেই, রসও নেই।”
গোসিংগা ইউনিয়নের গাছি আব্দুল আলী বলেন, কারখানা বেড়ে যাওয়ায় গাছ কমেছে। এবার তিনি অন্যের প্রায় ১৫০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন। তার ভাষায়, “একটি গাছ থেকে চার মাস রস পাওয়া যায়। মাসে ৫০ হাজার টাকার মতো আয় হয়। এবার কাঁচা রস কেজি ৫০ টাকা, পাটালি গুঁড় ৪৫০ এবং রশি গুঁড় ৩০০ টাকা।”
রস সংগ্রহের ঝুঁকির কথাও জানান গাছি হোসেন আলী। রশি বেঁধে গাছের মাথায় উঠে পরিষ্কার করা, ঘটি ঝোলানো, সব মিলিয়ে কাজটি অত্যন্ত বিপদজনক। বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো গাছে উঠতে পারেন না।
সাতখামাইর এলাকার প্রবীণ আব্দুল মোতালেব (৮০) বলেন, “আমাদের এলাকায় ভোর হতেই রসের ধুম পড়ে যেত। এখন গাছগুলোও তেমন নেই, আর গাছিও নাই।”
মাওনা ইউনিয়নের সদস্য হাফেজ শামীম আহাম্মদ মৃধা বলেন,
“গাছি কম থাকার কারণ হচ্ছে শিল্পায়নের ফলে গাছ কমে যাচ্ছে। খেজুর রসের স্বাদ এখন স্মৃতির পাতায়। বাজারে চাহিদা আছে, কিন্তু রস পাওয়া যায় খুব কম। এখনই গাছ লাগানোর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বই ছাড়া খেজুর রস চিনবে না।”
১নং মাওনা ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা আতাউর সরকার ও তৈয়ব হোসেন খান জানান, “খেজুর গাছ থাকা সত্ত্বেও গাছি না পাওয়ায় নিজেদের চাহিদা পূরণের জন্য নিজেরাই নিজেদের গাছ কাটছি, যেন আমরা এবং নিকট প্রতিবেশিরা এই শীতকালীন মিষ্টি রসের স্বাদ থেকে বঞ্চিত না হই।”
স্থানীয় যুবক জাহিদ হাসান বাপ্পি বলেন, “রস আমার খুবই পছন্দের একটি জিনিস। একসাথে চার–পাঁচ গ্লাস খেতেও পারি। অনেক কষ্ট করে চার–পাঁচ দিন খুঁজে আজ অবশেষে এই দুই হাড়ি রস পেয়েছি।”
শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা জানান, খেজুর গাছ গ্রামীণ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অংশ। শিল্পায়ন ও অব্যবস্থাপনায় গাছ কমে গেছে। কৃষি বিভাগ সাধারণ মানুষকে গাছ লাগাতে উৎসাহিত করছে এবং প্রয়োজন হলে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেবে। তার মতে, এখনই উদ্যোগ না নিলে খেজুর রসের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]