জন্মের পর কেউ দেখেনি বাবার মুখ, কেউ জানে না মায়ের পরিচয়। তবুও তারা থেমে নেই স্বপ্ন দেখে, হাসে, বড় হওয়ার স্বপ্ন বুনে। এমন শত শত পরিচয়হীন ও অসহায় শিশুদের পরম মমতায় আগলে রেখেছে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেংরা এলাকায় অবস্থিত ‘শিশু পল্লী প্লাস’। এবারের ঈদুল ফিতরের আনন্দ ছুয়ে গেছে প্রতিটি হৃদয়। আনন্দে হাসি হৈহুল্লুরে কেটেছে এবারের ঈদ।
প্রায় ৩৭ বছর ধরে নিভৃতে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ নাগরিক প্যাট্রিশিয়া কার-এর একক উদ্যোগে ৫১ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠে এই আশ্রয়কেন্দ্র। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এর উদ্বোধন করেন। বর্তমানে এখানে আশ্রয় পেয়েছেন ১১১ জন অসহায় মা এবং ২৫৬ জন শিশু। সম্পূর্ণ বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠান শুধু আশ্রয়ই দেয় না নিশ্চিত করে থাকা-খাওয়া, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা।
এখানে বেড়ে ওঠা অনেক শিশুই তাদের প্রকৃত পরিচয় জানে না। তবে বড় হওয়ার পর তারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ধর্ম বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পায় যা মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য উদাহরণ। একই চত্বরে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য আলাদা প্রার্থনাগার, যা সহনশীলতা ও সহাবস্থানের সুন্দর চিত্র তুলে ধরে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, সমাজের অবহেলিত, বিধবা ও বঞ্চিত মা ও শিশুদের এখানে নিঃস্বার্থভাবে সেবা দেওয়া হয়। এবারের ঈদে তাদের আনন্দের জন্য সবকিছুই দেয়া হয়েছে। ঈদের দিন স্পেশাল খাবারের আয়োজনরকরা হয়। তাদের সব ধরনের প্রয়োজন পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। এখান থেকে অনেক শিশু উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা এই উদ্যোগের সফলতার বড় প্রমাণ। ১০১ জন কর্মী তিন শিফটে ভাগ হয়ে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন এই নিরাশ্রয় মানুষদের জন্য।
সবুজে ঘেরা এই প্রাঙ্গণে রয়েছে মেয়েদের ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার মাঠ। প্রতিবছর এখান থেকে অনেক মেয়ে বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। শুধু শিক্ষা বা খেলাধুলা নয়, উৎসবেও পিছিয়ে নেই তারা। ঈদ এলে নতুন পোশাক, উন্নত খাবার, নাচ-গান আর আনন্দে ভরে ওঠে পুরো পরিবেশ—ঠিক যেন একটি সাধারণ পরিবারের মতো।
মহিয়সী নারী প্যাট্রিশিয়া কার-এর এই মানবিক উদ্যোগ আজ শত শত শিশুর মুখে হাসি ফুটিয়েছে। রক্তের সম্পর্কের বাইরে থেকেও যে ভালোবাসা দিয়ে একটি সুন্দর পৃথিবী গড়া সম্ভব শিশু পল্লী প্লাস’ তারই এক জীবন্ত উদাহরণ।
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]