গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নের পেলাইদ মধ্য পাড়া এলাকায় সাপের রহস্যজনক দংশনের ঘটনায় পুরো গ্রামজুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। গত এক সপ্তাহে অন্তত ৩০ জনের বেশি মানুষ সাপের কামড়ে আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো—এতগুলো দংশনের ঘটনা ঘটলেও আক্রান্তদের কেউই এখনও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেননি। সবাই স্থানীয় এক কবিরাজের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁকভিত্তিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। এতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল জানান, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাড়িতে সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটছে। এতে তারা এখন ভয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। তিনি বলেন, “আমরা এখন রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারি না। বাড়ির চারপাশে সারারাত আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। কখন, কোন বাসিন্দা আক্রান্ত হয়—এই ভয়ে সবাই আতঙ্কে আছে।”
আরেক বাসিন্দা সাইফুদ্দিন শেখ ফাহিম বলেন, গত সপ্তাহে তার প্রতিবেশীসহ বেশ কয়েকজনকে সাপ কামড়েছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে কেউ না গিয়ে স্থানীয় কবিরাজের চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি জানান, সাপ আতঙ্কে এলাকার শিশুরাও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অভিভাবকরাও সন্তানদের একা বাইরে যেতে দিচ্ছেন না।
সাপের কামড়ে আহত স্থানীয় যুবক ইমরান বলেন, রাতে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ করে পায়ে ব্যথা অনুভব করেন। পরে রক্ত বের হতে দেখে বুঝতে পারেন সাপ কামড়েছে। তিনি জানান, “আমি সাপটাকে চোখে দেখিনি। ভয় পেয়ে পরিবার দ্রুত কবিরাজের কাছে নিয়ে যায়। এখন কিছুটা ভালো লাগছে, তবে পা ফুলে আছে।”
স্থানীয় কবিরাজ মো. আব্দুল মালেক দাবি করেন, গত এক সপ্তাহে তার কাছে ১৫–২০ জন সাপের দংশনের রোগী এসেছে। তার ভাষ্য, “একজন রোগীও সাপটিকে চোখে দেখেনি। আমি ঝাড়ফুক দিয়ে চিকিৎসা করছি। অনেকেই ভালো হয়েছে।”
গ্রামবাসীরা মনে করছেন, আক্রান্তদের বেশিরভাগই সাপ দেখতে পাননি, অর্থাৎ ঘটনাগুলো অদৃশ্যভাবে ঘটছে। এতে বিষয়টি আরও রহস্যজনক হয়ে উঠেছে, যা এলাকাবাসীর আতঙ্ককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত বাড়তে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে গুজবও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
এদিকে স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এলাকায় হয়তো ঝোপঝাড় বা ফসলি জমিতে লুকিয়ে থাকা বিষহীন দংশনকারী সাপের আধিক্য থাকতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পোকামাকড় বা কাঁটার আঘাতও সাপের কামড় বলে ভুল হতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ জরুরি।
শ্রীপুর উপজেলা বন কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান বলেন, “সাপ সাধারণত নিরীহ প্রাণী। সুযোগ পেলেই তারা মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে যায়। সাপ কেবল তখনই কামড়ায়, যখন তারা নিজেদের হুমকির মুখে মনে করে।” তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ সাপই বিষহীন হওয়ায় আতঙ্কিত না হয়ে স্থানীয় বন বিভাগকে জানালে তারা দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে অবমুক্ত করতে পারবেন।
তিনি জানান, সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। বিশেষ করে ইঁদুর ও অন্যান্য ক্ষতিকর প্রাণী নিয়ন্ত্রণে সাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সাপ দেখলে মারার চেষ্টা না করে বন বিভাগকে জানানো উচিত।
এদিকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বরমী এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে কোনো সাপের দংশনের রোগী আসেনি। তিনি বলেন, “সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি দেখেছি। কিন্তু এদের বেশিরভাগই আসলে সাপের কামড় নয়। এসব নিয়ে এলাকায় ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কাউকে সত্যিকারের বিষধর সাপ কামড়ায়, তাকে অবশ্যই হাসপাতালে এনে অ্যান্টিভেনম দিতে হবে। কবিরাজি চিকিৎসায় বড় ধরনের বিপদ ঘটতে পারে। তাই যেকোনো দংশনের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত এলাকায় সাপ ধরার কার্যক্রম চালু করা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। নইলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ । ১০:১০ অপরাহ্ণ