আজ বুধবার ১১ মার্চ, ২০২৬ | ২১ রমজান, ১৪৪৭ | ২৬ ফাল্গুন, ১৪৩২ বসন্তকাল

বিদেশি মাল্টায় শ্রীপুরে নতুন সম্ভাবনা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫ । ১০:৪৯ অপরাহ্ণ
গাজীপুরের শ্রীপুরে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদেশি মাল্টা চাষে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মতিউর রহমান। চাকরি ছেড়ে কৃষিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি গড়ে তুলেছেন দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় মাল্টা বাগান ‘বাওয়ানী এগ্রো ট্যুরিজম’। ইউটিউবে দেখে স্ব-শিক্ষায় আধুনিক মাল্টা চাষ প্রযুক্তি আয়ত্ত করে তিনি এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন এলাকাজুড়ে।
উপজেলার বরমী ইউনিয়নের ডালেশহর সাতখামাইর এলাকায় প্রায় ৭ বিঘা জমিজুড়ে তৈরি হয়েছে তাঁর এই মাল্টা বাগান। চার বছর আগে শুরু করা এই বাগানে বর্তমানে রয়েছে ৫০০ মিশরীয় হলুদ মাল্টা গাছ এবং ৬০টি দার্জিলিং কমলা গাছ। সঠিক পরিচর্যা, উন্নত প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের ফলে এসব গাছ এখন ফলের ভারে নুয়ে পড়েছে। এটি তাঁর দ্বিতীয় বাণিজ্যিক ফলন, যা ইতোমধ্যেই শ্রীপুরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
মতিউর রহমান জানিয়েছেন, প্রথম বছর গাছপ্রতি প্রায় ২০ কেজি মাল্টা পেয়েছিলেন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় আগের বার ফলন উল্লেখযোগ্য ছিল। তবে চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তবুও পুরো বাগান থেকে প্রায় ৩ হাজার কেজি মাল্টা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি আশা করছেন। বাজারে বিদেশি হলুদ মাল্টার চাহিদা বেশি হওয়ায় তিনি এই ফলন থেকে প্রায় ১ কোটি টাকার মতো আয় প্রত্যাশা করছেন।
তিনি বলেন, “আমি সবসময় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষিতে বিশ্বাস করি। ইউটিউব দেখে শিখেছি, বিদেশি কৃষকের চাষাবাদের ভিডিও থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছি। পরে নিজের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে মাল্টার গাছ লাগাই। পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে শুরু করি। এখন এর ফলেই আমার জীবনে নতুন অধ্যায় তৈরি হয়েছে।”
বাগান ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি গাছে ঝুলে থাকা হলুদ মাল্টা বাগানকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বাগানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পড়ে সুপরিকল্পিত নকশা ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। পর্যটকদের জন্য রয়েছে আলাদা হাঁটার পথ, বসার জায়গা, ছবি তোলার স্পট এবং ছায়া বিশ্রামকেন্দ্র। প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যটনেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মাওনা থেকে বাগান পরিদর্শনে আসা কনটেন্ট ক্রিয়েটর শাজাহান মল্লিক বলেন, “এই মৌসুমে ভিটামিন সি আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। এখানে আমরা যে বিশুদ্ধ ও অর্গানিক মাল্টা পাচ্ছি, তা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং ভেজালমুক্ত। এটি আমাদের কাছে সত্যিই এক ধরনের সফলতা।”
শ্রীপুর পৌরসভা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা রেজাউল করিম কৌশিক বলেন, “ফেসবুকে ভিডিও দেখে স্ত্রীর আবদারে এখানে আসলাম। আমি ব্যাংকে চাকরি করি, তবে এখানে এসে আমারও ইচ্ছে হচ্ছে চাকরি ছেড়ে কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার। খুব শিগগিরই মতিউর ভাইয়ের পরামর্শ নিতে আসব।
বাগান পরিচর্যা কর্মী নুরল হক জানান, “এখানে যারা ঘুরে আসেন, তারা মাল্টা দেখে হাতে করে কয়েক কেজি ফল কিনে নিয়ে যান। কেউ ৬০০ টাকা দিয়ে দুই কেজি মাল্টা নিয়ে যান, কেউ আবার পুরো পরিবারকে নিয়ে আসেন ছবি তোলার জন্য। এর ফলে স্থানীয় শ্রমিকদের জন্যও নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
মাল্টা বাগান ঘিরে স্থানীয় অর্থনীতিও চাঙা হতে শুরু করেছে। আশপাশের গ্রামের অনেক মানুষ এখানে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। কেউ ফল সংগ্রহে, কেউ পরিচর্যায়, কেউ আবার পর্যটক ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে ব্যবসার বিস্তারও ঘটেছে।
মতিউর রহমান বলেন, “আমার লক্ষ্য ছিল এমন কিছু করা, যা কৃষিভিত্তিক হলেও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। শুধু নিজে সফল হওয়া নয়, এলাকার মানুষকেও এই পথে উদ্বুদ্ধ করতে চাই।”
শ্রীপুরে আগে বিদেশি জাতের মাল্টা চাষ তেমন জনপ্রিয় ছিল না। কিন্তু মতিউরের সফলতা এখন অনেকের মাঝেই নতুন উৎসাহ জাগিয়েছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, দেশে উপযুক্ত পরিচর্যা ও পরিবেশ থাকলে বিদেশি মাল্টা চাষ ব্যাপক সম্ভাবনাময় একটি খাত হতে পারে।
চাকরি ছেড়ে কৃষিকে বেছে নেওয়া মতিউর রহমান আজ শ্রীপুরে সফলতার অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ। বিদেশি মাল্টা চাষে তাঁর এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এলাকার কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা জানিয়েছেন, “শ্রীপুরের মাটি ও জলবায়ু মাল্টা চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। মতিউর রহমানের এই সফল উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে এলাকায় আরও অনেকে মাল্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কৃষি বিভাগও নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে তাদের সহায়তা করছে।”
এছাড়া স্থানীয় যুবক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা মনে করছেন, মতিউরের এই উদ্যোগ এলাকার তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা মনোভাব জাগাতে সহায়ক হচ্ছে। শ্রীপুরে এখন অনেকেই চাকরি ছেড়ে কৃষি খাতে নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করার চিন্তা করছেন। ফলে শুধু কৃষি চাষ নয়, পর্যটন, বিক্রয় ও স্থানীয় অর্থনীতিরও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।

প্রিন্ট করুন